
১৯৬২ সালের একদিন, কেরালার সমুদ্রতীরের ছোট্ট গ্রাম থুম্বায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক মানুষ। চারদিকে নারকেল গাছ, মাছধরা নৌকা, নোনা হাওয়া, সাধারণ মানুষের বসতি—দেখে কোনোভাবেই মনে হওয়ার কথা নয় যে ভারতের ভবিষ্যৎ মহাকাশযাত্রার প্রথম অধ্যায় এখানেই লেখা হতে চলেছে।
কিন্তু বিক্রম সারাভাই অন্য চোখে জায়গাটিকে দেখছিলেন।
তিনি সমুদ্র দেখছিলেন না, গ্রামের পথ দেখছিলেন না—তিনি যেন পৃথিবীর অদৃশ্য magnetic lines দেখছিলেন। থুম্বা ছিল magnetic equator-এর খুব কাছে। উচ্চ বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত জায়গা ভারতে খুব কমই ছিল।
সমস্যা একটাই।
সেই আদর্শ জায়গাটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটি গির্জা।
St. Mary Magdalene Church।
তার পাশে Bishop-এর বাড়ি, একটি স্কুল, আর বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবন।
এখন ভাবুন দৃশ্যটা।
একজন তরুণ বিজ্ঞানী এসে বলছেন—এই জায়গাটি ভারতের মহাকাশ গবেষণার জন্য প্রয়োজন।
তার হাতে তখন কোনো Chandrayaan নেই, কোনো PSLV নেই, কোনো বিশাল ISRO-ও নেই। এমনকি ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচি সফল হবে—তার নিশ্চয়তাও কেউ দিতে পারছে না।
আছে শুধু একটি স্বপ্ন।
এবং সেই স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি গির্জা।
Sarabhai গেলেন Trivandrum-এর Bishop Peter Bernard Pereira-র কাছে। তাঁর কথা মন দিয়ে শুনলেন Bishop। তারপর অদ্ভুত একটি উত্তর দিলেন—
আগামীকাল রবিবার। আবার আসুন।
পরদিন সকাল।
গির্জায় প্রার্থনা চলছে। চারদিকে গ্রামের মানুষ। Bishop তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে সেই বিজ্ঞানীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, এই মানুষটি এমন এক কাজের জন্য আমাদের church এবং আশপাশের জমি চাইছেন, যার উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ।
তারপর তিনি congregation-এর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন—তোমরা কি রাজি?
সেই মুহূর্তটিকে ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে যতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত, হয়তো আমরা ততটা দিই না।
কারণ মানুষগুলো রাজি হয়েছিল।
একটি গির্জার প্রার্থনাকক্ষ ধীরে ধীরে হয়ে উঠল laboratory।
Bishop-এর residence হয়ে গেল scientists-দের office।
আর সেই শান্ত সমুদ্রতীরবর্তী গ্রামে শুরু হয়ে গেল ভারতের মহাকাশযাত্রার প্রস্তুতি।
তারপর এল ২১ নভেম্বর ১৯৬৩।
থুম্বার আকাশে উঠে গেল একটি ছোট্ট sounding rocket—Nike-Apache।
আজকের Chandrayaan বা Gaganyaan-এর পাশে সেটিকে খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের প্রথম পদক্ষেপগুলো সাধারণত খুব বড় দেখায় না।
সেদিন সেই rocket-এর সঙ্গে কোনো মানুষ মহাকাশে যাচ্ছিল না। কোনো satellite-ও orbit-এ বসানো হচ্ছিল না। বিজ্ঞানীরা শুধু পৃথিবীর উপরের বায়ুমণ্ডলকে বুঝতে চাইছিলেন।
কিন্তু আসল ঘটনা rocket-এর উচ্চতায় ছিল না।
আসল ঘটনা ছিল—ভারত প্রথমবার নিজের চোখে আকাশকে বৈজ্ঞানিকভাবে পড়তে শুরু করেছিল।
আর Sarabhai জানতেন, বিদেশি rocket দিয়ে শুরু করলেও ভারতকে চিরকাল অন্যের প্রযুক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা চলবে না।
কয়েক বছরের মধ্যেই সেই থুম্বা থেকেই উঠল ভারতের নিজস্ব sounding rocket।
ছোট্ট একটি church থেকে শুরু হওয়া পরীক্ষাগার তখন নিজের ভাষায় মহাকাশের সঙ্গে কথা বলতে শিখছে।
কিন্তু এখানেই Sarabhai-র গল্পকে শুধু rocket-এর গল্প ভাবলে ভুল হবে।
কারণ তাঁর স্বপ্নে মহাকাশ ছিল না কোনো prestige project।
তিনি ভাবছিলেন গ্রামের কথা।
শিক্ষার কথা।
আবহাওয়ার খবরের কথা।
কৃষকের কথা।
দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের কথা।
একটি satellite যদি আকাশে থাকে, তবে কি তার সাহায্যে হাজার মাইল দূরের কোনো গ্রামের শিশুর কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া যায়?
একজন কৃষককে কি আবহাওয়ার তথ্য দেওয়া যায়?
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কি communication পৌঁছে দেওয়া যায়?
এই প্রশ্নগুলোই Sarabhai-কে অন্যরকম করে তোলে।
তিনি আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর চোখ আসলে মাটির মানুষের উপরই ছিল।
বছর কয়েক পরে satellite television ব্যবহার করে ভারতের হাজার হাজার গ্রামে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান পৌঁছল। আজ weather satellite কৃষকের কাজে লাগে, communication satellite দেশের এক প্রান্তকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত রাখে, remote sensing নদী, বন, মাটি, দুর্যোগ—সবকিছু বুঝতে সাহায্য করে।
এইসব দেখে মাঝে মাঝে থুম্বার সেই গির্জাটির কথা মনে করা উচিত।
কারণ একটি সময় ছিল, যখন ভারতের space programme-এর office বলতে ছিল Bishop-এর বাড়ি, laboratory বলতে ছিল church-এর একটি ঘর, আর ভবিষ্যৎ বলতে ছিল কয়েকজন মানুষের বিশ্বাস।
সেদিন কেউ জানত না একদিন ভারত চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে spacecraft নামাবে।
কেউ জানত না পৃথিবী ভারতের launch vehicle-এর উপর satellites পাঠানোর জন্য নির্ভর করবে।
কেউ জানত না “ISRO” নামটি একদিন বিশ্বের কাছে technological confidence-এর প্রতীক হয়ে উঠবে।
Sarabhai-ও হয়তো সেই ভবিষ্যতের প্রতিটি দৃশ্য দেখতে পাননি।
কিন্তু তিনি একটি জিনিস বুঝেছিলেন—
একটি দেশের বড় হওয়া শুরু হয় তখনই, যখন সে নিজের বর্তমান সীমাবদ্ধতাকে তার ভবিষ্যতের সীমা বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে।
আর তাই ১২ আগস্ট বিক্রম সারাভাইকে স্মরণ করতে গেলে তাঁর জন্মতারিখের পাশে শুধু “Father of Indian Space Programme” লিখে দিলেই গল্প শেষ হয়ে যায় না।
বরং ফিরে যেতে হয় সেই রবিবার সকালে।
একটি church।
কয়েকজন সাধারণ মানুষ।
একজন Bishop।
আর এক বিজ্ঞানী, যিনি তাঁদের সামনে এমন একটি ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন যা তখনও কেউ চোখে দেখেনি।