
বন্ধুরা তাঁকে বোঝাচ্ছিলেন—
“আর কত কষ্ট সহ্য করবেন? আবার পৈতে ধারণ করুন। সব সমস্যা মিটে যাবে। সমাজ আপনাকে আবার গ্রহণ করবে।”
কথাগুলো শুনে মানুষটি উত্তেজিত হলেন না। কারও সঙ্গে তর্কও করলেন না। শুধু শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন—
“যা করেছি, করেছি। আর ফিরে যাব না।”
একটি সুতোই তো! আবার গলায় পরে নিলেই কত ঝামেলার অবসান হয়।
আত্মীয়েরা কাছে আসবেন। প্রতিবেশীরা আর ঘৃণার চোখে দেখবেন না। বাড়ির কাজে সাহায্য করার মানুষ পাওয়া যাবে। সমাজের দরজাটিও আবার খুলে যাবে।
কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ঘরে ফিরতে গেলে তাঁকে নিজের বিবেকটিকে বাইরে রেখে আসতে হবে।
সেটি তিনি পারলেন না।
তাঁর নাম রামতনু লাহিড়ী।
পেশায় শিক্ষক। কিন্তু তাঁর জীবনই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পাঠশালা।
রামতনুর জন্ম ১৮১৩ সালে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে। যে সমাজে জন্মের পরিচয়ই মানুষের মর্যাদা, খাদ্যাভ্যাস, সম্পর্ক—এমনকি কার ছোঁয়া গ্রহণ করা যাবে, তাও নির্ধারণ করত, সেখানে ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর সামনে একটি নিরাপদ পথ খোলা ছিল।
সেই পথ ধরে তিনি অনায়াসে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন।
কিন্তু তাঁর জীবনের শুরুটাই খুব সহজ ছিল না।
পরিবার তাঁকে ইংরেজি শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। বড় ভাই কেশব ১৮২৬ সালে ছোট ভাইকে কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। কেশবের মাসিক আয় ছিল মাত্র ত্রিশ টাকা। সেই সামান্য আয়ে নিজের সংসার চালিয়ে ছোট ভাইয়ের থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে উঠেছিল।
কলকাতায় এসেই রামতনু কোনো নামী বিদ্যালয়ের সাজানো ছাত্রাবাসে জায়গা পাননি। বড় ভাই যতটা পারতেন, বাড়িতেই তাঁকে শেখাতেন। ফারসি, আরবি এবং হাতের লেখা—সবকিছুর প্রাথমিক শিক্ষা চলেছিল ভাইয়ের কাছে।
পরে ডেভিড হেয়ারের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে পড়ার সুযোগ এল। মেধা ও পরিশ্রমের জোরে বৃত্তি পেয়ে ১৮২৮ সালে তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হলেন।
সেখানেই তাঁর জীবনে এলেন এক আশ্চর্য শিক্ষক—হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।
ডিরোজিও ছাত্রদের শুধু উত্তর মুখস্থ করতে শেখাতেন না। তিনি প্রশ্ন করতে শেখাতেন।
যে বিশ্বাস পরিবার থেকে পেয়েছ, সেটি কি সত্যিই যুক্তিসংগত?
কোনো প্রথা বহু বছর ধরে চলে আসছে বলেই কি তা ন্যায়সংগত?
সমাজ যা বলছে, নিজের বিবেকও কি ঠিক সেই কথাই বলছে?
সে সময়ের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নগুলো ছিল প্রায় বিস্ফোরণের মতো। সমাজ চাইত অনুগত সন্তান; ডিরোজিও তৈরি করছিলেন স্বাধীন চিন্তার মানুষ।
তাঁর ছাত্রদের প্রতি বার্তাটি ছিল—প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছু বিশ্বাস কোরো না; সত্যকে ভালোবাসো এবং প্রয়োজনে সত্যের জন্য দাঁড়াও।
রামতনু সেই কথাগুলো শুধু খাতায় লিখে রাখেননি। কথাগুলো তাঁর চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল।
কয়েক বছর পর ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল—তিনি ছাত্রদের ধর্ম ও সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলছেন। অল্পদিনের মধ্যেই মাত্র বাইশ বছর বয়সে ডিরোজিওর মৃত্যু হয়।
কিন্তু একজন সত্যিকারের শিক্ষক কি মৃত্যুর পর শেষ হয়ে যান?
রামতনুর জীবন বলছে—না।
ডিরোজিওর শেখানো প্রশ্নগুলো তাঁর ছাত্রের মধ্যেই বেঁচে রইল।
পড়াশোনা শেষ করে রামতনু শিক্ষকতাকেই নিজের জীবন হিসেবে বেছে নিলেন।
তখন তাঁর সামনে আরও লাভজনক পেশায় যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, সেই সময় বাংলার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুধু শিক্ষিত মানুষের নয়—সৎ ও দক্ষ শিক্ষকের।
শিক্ষকতা তাঁর কাছে কোনো সাময়িক চাকরি ছিল না। জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে উপযুক্ত পথ এবং সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে গভীর মাধ্যম ছিল।
তিনি হিন্দু কলেজের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে কৃষ্ণনগর, বর্ধমান, উত্তরপাড়া, বারাসত, রসাপাগলা ও বরিশালের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কোথাও শিক্ষক, কোথাও প্রধান শিক্ষক। জায়গা বদলেছে, ছাত্র বদলেছে—কিন্তু তাঁর শিক্ষাদর্শ বদলায়নি।
রামতনু মুখস্থবিদ্যার বিরোধী ছিলেন।
একদিন ক্লাসে ‘Arabia’ শব্দটি পাওয়া গেল—এমন উদাহরণ তাঁর জীবনীতে আছে। সাধারণ শিক্ষক হয়তো মানচিত্রে আরবের অবস্থান দেখিয়ে পরের শব্দে চলে যেতেন।
রামতনু থামতেন।
আরবের ভূপ্রকৃতি কেমন, সেখানে কারা বাস করেন, মানুষের জীবনযাত্রা কী, তাদের ধর্মবিশ্বাস কীভাবে গড়ে উঠেছে, ইতিহাসে মুহাম্মদের ভূমিকা কী—একটি শব্দ থেকে খুলে দিতেন জ্ঞানের একটি বিরাট জানালা।
ফলে তাঁর ছাত্ররা হয়তো পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা একটু ধীরে শেষ করত। কিন্তু তাদের মন দ্রুত বড় হয়ে উঠত।
তিনি তথ্য দিতেন না শুধু—তথ্যগুলোর মধ্যে সম্পর্ক দেখতে শেখাতেন।
আজ আমরা যাকে interdisciplinary learning বলি, প্রায় দুই শতাব্দী আগে রামতনু নিজের শ্রেণিকক্ষে সেই কাজটিই করতেন।
তাঁর ক্লাসে ছাত্র শুধু শ্রোতা ছিল না।
কোনো ছাত্র তাঁর ভুল ধরিয়ে দিলে তিনি অপমানিত বোধ করতেন না। নতুন ব্যাখ্যা ভালো হলে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতেন। বয়স আশির কাছাকাছি পৌঁছেও নতুন কোনো কথা শুনলে খাতা বের করে লিখে রাখতেন।
একজন শিক্ষক ছাত্রের সামনে নিজের ভুল স্বীকার করলে তাঁর মর্যাদা কমে যায়—রামতনু এমনটি বিশ্বাস করতেন না।
বরং তিনি জানতেন, শিক্ষক নিজেকে সর্বজ্ঞ ভাবতে শুরু করলে তাঁর নিজের শিক্ষাই সেদিন থেমে যায়।
উত্তরপাড়া স্কুলে প্রায় আড়াইশো ছাত্র ছিল।
রামতনু ও তাঁর সহকারী শুধু ছাত্রদের নাম জানতেন না। তাঁদের বাবার নাম, বাড়ি কোথায়—এসবও মনে রাখতেন বলে প্রাক্তন ছাত্রদের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়।
ভাবলে ঘটনাটি আজও বিস্ময়কর।
একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক আড়াইশো শিশুর মধ্যে কেবল roll number দেখছেন না; প্রতিটি নামের সঙ্গে একটি পরিবার, একটি বাড়ি, একটি আলাদা জীবন চিনে রাখছেন।
তিনি খেলার মাঠেও উপস্থিত থাকতেন। কখনো ছাত্রদের খেলার umpire হতেন। তাঁর উপস্থিতিতে ছাত্ররা শৃঙ্খলা বজায় রাখত—শুধু শাস্তির ভয়ে নয়, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়।
দুর্বল ছাত্রকে অপমান না করে তার প্রয়োজন বুঝতে চেষ্টা করতেন। ছাত্রদের মধ্যে এমন বিশ্বাস তৈরি করতেন যে প্রত্যেক মানুষেরই পৃথিবীতে কিছু কাজ আছে। নিজের কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে করার মধ্যেই মানুষের আনন্দ ও মর্যাদা।
একজন প্রাক্তন ছাত্রের স্মৃতিতে রামতনুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক একটি পবিত্র দায়িত্ব, এবং ছাত্রজীবনের পরিশ্রমই ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত।
এই জন্যই ছাত্ররা তাঁকে শুধু শিক্ষক বলে ভাবত না।
তারা তাঁকে পিতার মতো ভালোবাসত।
কিন্তু যে মানুষটি ছাত্রদের কাছে এত প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, নিজের সমাজের কাছে তিনিই একসময় হয়ে গেলেন অগ্রহণযোগ্য।
ঘটনাটি তাঁর জীবনীতে এসেছে প্রায় হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক মুহূর্তের মতো।
একদিন কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে নৌকায় ভ্রমণ করছিলেন রামতনু। মুসলমান মাঝিদের রান্না করা সুস্বাদু খাবার তাঁরা সবাই মিলে খাচ্ছিলেন।
সেই সময় দলের একজন রসিকতা করে বলে উঠলেন—
“মুসলমানের রান্না করা খাবার তো আনন্দ করে খাচ্ছি, অথচ ব্রাহ্মণ্য পবিত্রতার প্রতীক পৈতেটিও গলায় রেখে দিয়েছি! আমরা কি নিজেদের সঙ্গে ভণ্ডামি করছি না?”
কথাটি রসিকতা হিসেবেই বলা হয়েছিল।
অন্যরা হয়তো হেসেছিলেন।
রামতনুর হাসি পেল না।
একটি নিরীহ বাক্য তাঁর মনের মধ্যে আয়নার মতো দাঁড়িয়ে গেল।
তিনি যদি সত্যিই জাতিভেদের কঠোরতা বিশ্বাস না করেন, তবে শুধু সমাজকে সন্তুষ্ট করার জন্য তার প্রতীক বহন করছেন কেন?
বিশ্বাস একরকম, আচরণ আরেকরকম—এ কি শিক্ষিত মানুষের পরিচয়?
যে ছাত্রদের তিনি সত্যবাদী হতে শেখান, তাদের সামনে নিজেই কি একটি অসত্য জীবন যাপন করছেন না?
সেদিনই তিনি পৈতে ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন বলে শিবনাথ শাস্ত্রীর জীবনীতে বর্ণিত হয়েছে।
কাজটি বাইরে থেকে খুব ছোট।
কিন্তু উনিশ শতকের কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজে পৈতে ত্যাগ করা শুধু একটি সুতো খুলে ফেলা ছিল না। তার অর্থ ছিল নিজের জন্মগত সামাজিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। পরিবার, আত্মীয়তা, সামাজিক নিরাপত্তা—সবকিছুকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
রামতনু সেই মূল্য দিলেন।
তাঁকে একঘরে করা হলো। অনেকেই তাঁর সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক রাখতে চাইলেন না। গৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজ চালানোর জন্য সাহায্যকারী পাওয়া কঠিন হয়ে উঠল।
উত্তরপাড়ায় তাঁর অবস্থা এমন হয়েছিল যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বারবার তাঁর জন্য গৃহকর্মীর ব্যবস্থা করতে হয়েছিল বলে জীবনীতে উল্লেখ আছে।
বন্ধুরা তখন একটি সহজ সমাধান দিয়েছিলেন—
আবার পৈতে পরে নিন।
কেউ তো তাঁর মনের ভিতর দেখবে না। বাইরে চিহ্নটি থাকলেই সমাজ শান্ত হবে।
কিন্তু রামতনুর কাছে এটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন প্রস্তাব।
কারণ সমাজের সঙ্গে সমঝোতা করতে গিয়ে তাঁকে নিজেরই শেখানো শিক্ষাকে অস্বীকার করতে হতো।
তিনি জানিয়ে দিলেন—
“আমি যা করেছি, করেছি।”
এই কথার মধ্যে গর্জন ছিল না। কোনো মঞ্চের বক্তৃতা ছিল না। ছিল নিজের সিদ্ধান্তের সমস্ত পরিণতি মেনে নেওয়ার নীরব সাহস।
তবে এই ঘটনাটিকে শুধু ধর্মীয় প্রথার পক্ষে বা বিপক্ষে একটি বিবাদ হিসেবে দেখলে রামতনুকে ছোট করে দেখা হবে।
রামতনুর আসল বক্তব্য ছিল আরও গভীর।
তিনি কাউকে নিজের মতো পৈতে ত্যাগ করতে বলেননি। তিনি ছাত্রদের কোনো নতুন মতবাদ অন্ধভাবে মানতেও শেখাননি।
তিনি শিখিয়েছিলেন—নিজে চিন্তা করো।
নিজের সিদ্ধান্তের কারণ বোঝো।
তারপর সেই সিদ্ধান্তের দায়ও নিজে বহন করো।
সমাজের বিরোধিতা করলেই কেউ মহান হয়ে যায় না। কিন্তু যে বিশ্বাসকে সত্য বলে বুঝেছ, শুধু সুবিধা পাওয়ার জন্য তার বিপরীত অভিনয় না করা—এই সততাই রামতনুর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
তাঁর শিক্ষকতা আর ব্যক্তিজীবনের মধ্যে কোনো দেয়াল ছিল না।
ক্লাসে তিনি যা শেখাতেন, জীবনে সেটিই পালন করার চেষ্টা করতেন।
এই কারণেই তাঁর ছাত্রদের কাছে তাঁর কথার এত মূল্য ছিল।
রামতনুর জীবন শুধু সামাজিক বিরোধিতায় নয়, ব্যক্তিগত বেদনাতেও ভরা ছিল।
ম্যালেরিয়া তাঁর শরীরকে দুর্বল করে দিয়েছিল। সন্তানদের অকালমৃত্যু তাঁকে বারবার ভেঙেছে। নিজের নতুন বাড়িতে শান্তভাবে শেষ জীবন কাটানোর ইচ্ছাও পূর্ণ হয়নি। অসুখ ও মৃত্যুর কারণে তাঁকে প্রিয় কৃষ্ণনগর ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে হয়েছিল।
তবু মানুষের প্রতি তাঁর কোমলতা কমেনি।
অবসর নেওয়ার পরেও শিশু, নারী ও পুরুষ—যে শিখতে চাইত, তাকে কাছে বসিয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় শেখাতেন। অবসর সময়ে ছোটদের সঙ্গে কথা বলতেন, পাখিদের খাবার দিতেন, বাগানে কাজ করতেন।
এক বন্ধুর স্মৃতিতে একটি সুন্দর সকালের কথা পাওয়া যায়।
ভোর হয়েছে। প্রকৃতি আলোয় ভরে উঠেছে। রামতনু এক ঘুমন্ত বন্ধুকে প্রায় টেনে তুললেন। এমন সুন্দর সকালে শুয়ে থাকা যায়?
তাঁকে নিয়ে গেলেন মাঠে। উদিত সূর্য, গাছপালা আর সকালের আলো দেখিয়ে আবেগে আবৃত্তি করতে শুরু করলেন Wordsworth-এর কবিতা।
এ দৃশ্যটি রামতনুর আরেকটি পরিচয় দেয়।
তাঁর কাছে শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে ছিল না। একটি ফুটে থাকা গোলাপ, ভোরের আলো, একটি কবিতা, খেলার মাঠ, ছাত্রের প্রশ্ন—সবই ছিল শিক্ষার উৎস।
তিনি বৃদ্ধ বয়সেও নতুন কিছু শুনলে শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত হতেন।
যে শিক্ষক নিজে বিস্মিত হতে জানেন না, তিনি ছাত্রের মনে বিস্ময় জাগাবেন কীভাবে?
রামতনু সেই ক্ষমতা শেষ বয়স পর্যন্ত হারাননি।
১৮৯৮ সালে তাঁর মৃত্যু হলো।
তখন তাঁর কোনো বিশাল সম্পত্তি ছিল না। কোনো রাজপদও নয়। তিনি এমন কোনো পাঠ্যবই লেখেননি, যার নাম প্রতিটি বাঙালি আজও মনে রেখেছে।
তবে মৃত্যুর পরে তাঁর কাছে ফিরে এলেন তাঁর ছাত্ররা।
কেউ পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন। কেউ তাঁর স্মৃতি রক্ষার উদ্যোগ নিলেন। উত্তরপাড়া স্কুলে তাঁর স্মরণে ফলক স্থাপনের পেছনেও প্রাক্তন ছাত্রদের ভূমিকা ছিল।
জীবনে যে সমাজ তাঁকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, মৃত্যুর পর ছাত্রদের হৃদয় তাঁকে আরও কাছে টেনে নিয়েছিল।
কারণ একটি শিশু বড় হয়ে হয়তো পাঠ্যবইয়ের অনেক উত্তর ভুলে যায়।
কিন্তু যে শিক্ষক তাকে প্রথমবার নিজের মূল্য বুঝতে সাহায্য করেছিলেন—তাঁকে সে সহজে ভুলতে পারে না।
আজ আমাদের বিদ্যালয়ে প্রযুক্তি আছে। স্মার্ট বোর্ড আছে। ডিজিটাল কনটেন্ট আছে। পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণের জন্য software আছে।
কিন্তু রামতনুর গল্প আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—
শিক্ষার্থীরা কি আমাদের কাছ থেকে শুধু তথ্য পাচ্ছে, না সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সাহসও শিখছে?
আমরা কি তাদের সঠিক উত্তর মুখস্থ করাচ্ছি, না সঠিক প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছি?
ছাত্র আমাদের ভুল ধরলে আমরা কি তাকে থামিয়ে দিই, না তার কথা মন দিয়ে শুনি?
বিদ্যালয়ে আমরা যে মূল্যবোধ শেখাই, বিদ্যালয়ের বাইরে আমাদের জীবন কি তার সাক্ষ্য দেয়?
রামতনু লাহিড়ীর জীবন নিখুঁত মানুষের গল্প নয়।
এটি এমন একজন সাধারণ মানুষের গল্প, যিনি নিজের বিবেকের সঙ্গে অসততা না করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ হতে পারে। তাঁর সব বিশ্বাসের সঙ্গে আমাদের একমত হওয়ারও প্রয়োজন নেই।
কিন্তু তাঁর সততা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
বন্ধুরা তাঁকে বলেছিলেন, সামান্য একটি সুতো আবার গলায় তুলে নিলেই সমস্ত সমস্যা মিটে যাবে।
তিনি জানতেন, সমস্যাটি সুতোয় নয়।
সমস্যাটি এই প্রশ্নে—
মানুষ কি সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নিজের বিবেকের কাছে মিথ্যা বলবে?
রামতনু সেই মিথ্যা বলতে পারেননি।
তাই সমাজ তাঁকে একঘরে করেছিল।
কিন্তু ছাত্ররা তাঁকে ছাড়েনি।
কারণ সমাজ তাঁর গলায় একটি সুতো খুঁজেছিল।
আর ছাত্ররা তাঁর জীবনের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল একজন সত্যিকারের শিক্ষককে।
—বাদল পাল
© Badal Pal