
ভাবুন তো, মহারাষ্ট্রের একটি ছোট্ট গ্রামের হাটে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন।
চারদিকে পরিচিত কোলাহল। কেউ মারাঠিতে দরদাম করছে, কেউ হিন্দিতে কথা বলছে। হঠাৎ আপনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষ সম্পূর্ণ অচেনা একটি ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন।
আপনি একটি শব্দও বুঝতে পারলেন না।
ভাবলেন, হয়তো কোনো আঞ্চলিক ভাষা। কিন্তু পাশের মারাঠিভাষী মানুষটিও বুঝলেন না। কোরকু ভাষা জানা লোকটিও মাথা নেড়ে বললেন—
“না, এ আমাদের ভাষা নয়।”
তাহলে ভাষাটি কার?
মহারাষ্ট্রের বুলঢানা জেলার জলগাঁও-জামোদ অঞ্চলে কয়েকটি ছোট জনপদে বসবাস করেন নীহালি জনগোষ্ঠীর মানুষ। সংখ্যায় তাঁরা খুবই কম। তাঁদের ভাষার নামও নীহালি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নীহালি ভাষার চারদিকে কোরকু, মারাঠি ও হিন্দির রাজত্ব। নীহালি মানুষদের অনেকেই এই ভাষাগুলো বলতে পারেন। বাজারে মারাঠি, সরকারি অফিসে হিন্দি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোরকু—যার সঙ্গে যে ভাষা প্রয়োজন, তাঁরা সেই ভাষাতেই কথা বলেন।
কিন্তু নিজেদের মধ্যে?
সেখানে দরজা খুলে যায় আরেকটি জগতের।
নীহালি।
এই ভাষার জন্ম কোথায়—আজ পর্যন্ত কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি।
বাংলা, হিন্দি ও মারাঠি ভাষার আত্মীয়দের চেনা যায়। তামিল, তেলুগু, কন্নড় ও মালয়ালামেরও একটি পরিবার আছে। সাঁওতালি, মুন্ডারি ও কোরকুরও ভাষাগত আত্মীয়স্বজন রয়েছে।
নীহালিকে নিয়ে সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
তার যেন কোনো পরিচিত পরিবার নেই।
ভাষাবিদেরা বহু বছর ধরে তার শব্দ খুলেছেন, ব্যাকরণ মিলিয়েছেন, আশপাশের ভাষার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নীহালিকে নিশ্চিতভাবে কোনো পরিচিত ভাষাপরিবারে বসাতে পারেননি।
যেন ভারতের ভাষার বিরাট যৌথ পরিবারে একটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে, অথচ কেউ জানে না—সে কোন হারিয়ে যাওয়া শাখার শেষ উত্তরাধিকারী।
আর এখান থেকেই শুরু হয় রহস্য।
নীহালি ভাষায় কোরকু, মারাঠি, হিন্দি এবং কিছু দ্রাবিড় ভাষা থেকে নেওয়া প্রচুর শব্দ রয়েছে। এত বেশি ধার করা শব্দ দেখে প্রথমে কোনো কোনো গবেষক সন্দেহ করেছিলেন—
এটি কি আদৌ একটি স্বাভাবিক মাতৃভাষা?
নাকি কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠী নিজেদের কথা বাইরের মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্য নানা ভাষার শব্দ মিশিয়ে একটি গোপন ভাষা তৈরি করেছিল?
সন্দেহটি আরও বেড়েছিল একটি কারণে।
আগেকার গবেষকেরা যখন নীহালি ভাষা জানতে গ্রামগুলোতে যেতেন, অনেক বক্তাই নাকি বাইরের মানুষের সামনে ভাষাটি সহজে ব্যবহার করতে চাইতেন না। কখনো তাঁদের ভুল শব্দ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও পুরোনো লেখায় পাওয়া যায়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল—
তাঁরা কী লুকোচ্ছিলেন?
কেন নিজেদের ভাষার দরজা বাইরের মানুষের জন্য বন্ধ রাখতেন?
কিছু গবেষক তখন নীহালিকে প্রায় একটি গোপন সংকেতব্যবস্থা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এমনকি ভাষাটিকে সমাজের প্রান্তিক বা সন্দেহভাজন মানুষের গোপন jargon হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।
কিন্তু বহু বছর পরে গবেষকেরা যখন সত্যিই তাঁদের মধ্যে বসে ভাষাটি রেকর্ড করলেন, তখন সামনে এল একেবারে অন্য ছবি।
নীহালি কোনো কয়েকটি সাংকেতিক শব্দের সংগ্রহ নয়।
এই ভাষায় মানুষ সম্পূর্ণ গল্প বলতে পারে। হাসতে পারে, কাঁদতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে। নিজেদের অতীতের কথা বলতে পারে। গান গাইতে পারে। লোককথা শোনাতে পারে। আনন্দ, দুঃখ, সম্পর্ক, জীবন ও মৃত্যু—সবকিছু প্রকাশ করতে পারে।
এমনকি ভাষাটির নিজস্ব ব্যাকরণও রয়েছে।
একজন, দুজন এবং অনেকজন বোঝানোর আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। বাক্যে কে কাজটি করল, কাকে করা হলো—তা বোঝানোর নিয়ম রয়েছে। ক্রিয়া বদলায়, শব্দের সঙ্গে চিহ্ন যুক্ত হয়, বাক্য তৈরি হয়।
অর্থাৎ নীহালি কোনো বানানো কোড নয়।
এটি একটি পরিপূর্ণ জীবন্ত ভাষা।
তাহলে নীহালি মানুষ বাইরের লোকের সামনে নিজেদের ভাষা বলতে চাইতেন না কেন?
সম্ভবত উত্তরটি রহস্যের চেয়েও বেশি মানবিক।
নীহালি জনগোষ্ঠী দীর্ঘকাল সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকেছে। তাদের সম্পর্কে বাইরের সমাজে নানা অপমানজনক ধারণা তৈরি হয়েছিল। পুরোনো লেখায় তাদের কখনো চোর, কখনো দস্যু, কখনো সন্দেহজনক জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কিন্তু সেই লেখাগুলো কারা লিখেছিলেন?
নীহালি মানুষেরা নিজেরা নয়।
লিখেছিলেন বাইরের মানুষ—যারা তাঁদের জীবনকে নিজেদের চোখ দিয়ে বিচার করেছিলেন।
যে সমাজ বারবার অপমানিত হয়েছে, সে কি বাইরের মানুষের সামনে নিজের সব কথা খুলে বলবে?
হয়তো নীহালি মানুষ বুঝেছিলেন—তাঁদের জমি নেই, ক্ষমতা নেই, সামাজিক সম্মান নেই; কিন্তু একটি জিনিস এখনো সম্পূর্ণ তাঁদের নিজের।
তাঁদের ভাষা।
বাইরের মানুষ মারাঠি বুঝবে। হিন্দি বুঝবে। কোরকুও বুঝতে পারে।
কিন্তু নীহালি?
না। সেই ঘরের চাবি শুধু তাঁদের কাছে।
ফলে ভাষাটি হয়তো তৈরি হয়নি গোপন কথাবার্তার জন্য, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছিল তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়। বাইরের মানুষ পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাঁরা নিজেদের কথা বলতে পারতেন—কেউ বুঝতে পারত না।
একটি ভাষা তখন শুধু ভাষা থাকে না।
সেটি হয়ে ওঠে অদৃশ্য দেয়াল।
কিন্তু নীহালির সবচেয়ে বড় রহস্য এখনো বাকি।
ভাষাটির বহু শব্দ প্রতিবেশী ভাষা থেকে এলেও কিছু অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাচীন শব্দের কোনো পরিচিত উৎস পাওয়া যায়নি। ‘রক্ত’, ‘ডিম’, ‘মাছ’, ‘গাছ’, ‘পাথর’, শরীরের নানা অঙ্গ—এমন কিছু মৌলিক শব্দ আশপাশের ভাষার সঙ্গে সহজে মেলে না।
সাধারণত ভাষার এই মৌলিক শব্দগুলো বহু পুরোনো স্মৃতি ধরে রাখে।
তাই গবেষকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে—
নীহালি কি এমন কোনো প্রাচীন ভাষার শেষ জীবিত অংশ, যে ভাষায় একসময় মধ্য ভারতের আরও অনেক মানুষ কথা বলত?
হয়তো বহু শতাব্দী আগে নতুন নতুন জনগোষ্ঠী ও ভাষা সেই অঞ্চলে এসেছে। পুরোনো ভাষাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। তার বক্তারা অন্য ভাষার শব্দ গ্রহণ করেছেন, নিজেদের ভাষা বদলেছেন।
কিন্তু একেবারে গভীরে কিছু পুরোনো শব্দ রয়ে গেছে।
যেমন কোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদের ওপর নতুন বাড়ি তৈরি হলেও মাটির নিচে পুরোনো ভিতটি থেকে যায়।
নীহালি কি তেমনই কোনো হারিয়ে যাওয়া ভাষাসভ্যতার শেষ ভিত?
আমরা জানি না।
এটুকুই এই গল্পের সবচেয়ে সৎ উত্তর।
কিন্তু রহস্যের সমাধান হওয়ার আগেই এখন ভাষাটির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
নীহালি বক্তার সঠিক সংখ্যা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কোনো গবেষণায় প্রায় দুই হাজার, কোথাও তার কিছু বেশি মানুষের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও চিন্তার বিষয় হলো—নীহালি ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন শিশু ও তরুণের সংখ্যা কত?
ধরুন, একটি নীহালি শিশু স্কুলে গেল।
সেখানে নীহালির কোনো বই নেই। শিক্ষক মারাঠিতে পড়ান। ভবিষ্যতে চাকরির জন্য হিন্দি ও ইংরেজি প্রয়োজন। মোবাইলে নীহালি নেই। টেলিভিশনে নেই। সরকারি কাজেও নেই।
শিশুটি তখন একটি কঠিন শিক্ষা পায়—
দাদুর ভাষা ভালোবাসার হতে পারে, কিন্তু জীবনে এগোতে হলে অন্য ভাষাই দরকার।
সে ধীরে ধীরে দাদুর সঙ্গে মারাঠিতে কথা বলতে শুরু করে।
দাদু প্রথমে নীহালিতে একটি গল্প বলেন। নাতি কয়েকটি শব্দ বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করে। দাদু এবার গল্পটি মারাঠিতে বলে দেন।
গল্পটি বেঁচে থাকে।
কিন্তু গল্পের আসল কণ্ঠস্বরটি একটু একটু করে মরে যায়।
এভাবেই একটি ভাষা হারায়।
কোনো রাজা এসে তাকে হত্যা করে না। কোনো সৈন্য তার বই পুড়িয়ে দেয় না। একদিন শুধু দেখা যায়—ভাষাটি বোঝেন এমন বৃদ্ধরা আছেন, কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো শিশু আর নেই।
নীহালি ভাষা নিয়ে গবেষকেরা এখন শব্দ, গান, গল্প এবং সাধারণ কথোপকথন রেকর্ড করছেন। প্রায় ২০ ঘণ্টার audio-video সংগ্রহও তৈরি হয়েছে। ব্যাকরণ লেখা হয়েছে, শব্দভান্ডার সংগ্রহ করা হয়েছে, অভিধান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়।
কোনো ভাষার কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে রাখলেই কি ভাষাটি বেঁচে থাকে?
একটি বিলুপ্ত পাখির ডাক recording-এ শোনা যায়। কিন্তু সেই ডাক আর কোনো ভোরে অরণনের মধ্যে ফিরে আসে না।
ভাষার ক্ষেত্রেও তাই।
কোনো archive-এ নীহালির শব্দ হাজার বছর বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু মা যদি শিশুকে সেই ভাষায় না ডাকেন, বন্ধুরা যদি সেই ভাষায় হাসাহাসি না করে, প্রেমিক যদি সেই ভাষায় ভালোবাসার কথা না বলে—তাহলে ভাষাটি জীবিত থাকবে না।
শেষ পর্যন্ত তাই নীহালির সবচেয়ে বড় রহস্য “এটি কি গোপন ভাষা?”—এই প্রশ্ন নয়।
সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—
নীহালির ভিতরে কি ভারতের এমন কোনো প্রাচীন মানুষের কণ্ঠ লুকিয়ে আছে, যাদের নাম ইতিহাসের কোনো বইয়ে লেখা হয়নি?
আর সবচেয়ে বড় ভয় হলো—
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার আগেই ভাষাটি যদি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়?
তখন হয়তো নীহালির সমস্ত শব্দ কোনো digital archive-এ থাকবে। গবেষকেরা তার ব্যাকরণ পড়বেন। শিক্ষার্থীরা ভাষাটি নিয়ে thesis লিখবে।
শুধু সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের উঠোনে বসে কেউ আর নীহালিতে গল্প বলবে না।
পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারাবে।
আর ভারত নিজের ইতিহাসের একটি দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ করে ফেলবে।
—বাদল পাল
© Badal Paul